ফরিদগঞ্জ প্রতিনিধি:
আসন্ন বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার মৃৎপল্লীগুলোতে বইছে উৎসবের আমেজ। বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত কাজ করছেন পালপাড়ার শিল্পীরা। নিপুণ তুলির আঁচড়ে মাটির পুতুল, হাতি, ঘোড়া আর হাঁড়ি-পাতিলকে রাঙিয়ে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন উপজেলার প্রায় ২০০ মৃৎশিল্পী পরিবার।
সরেজমিনে উপজেলার পাইকপাড়া উত্তর ইউনিয়নের পাইকপাড়া, শোল্লা ও মানুরী গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘরের আঙিনায় এখন মাটির সুবাস। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই কাজে মগ্ন। কেউ মাটি ছেনে মণ্ড তৈরি করছেন, কেউ চাকার সাহায্যে গড়ছেন হাঁড়ি-পাতিল, আবার কেউ রোদে শুকানো মাটির পাত্রগুলো আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করছেন। শেষ ধাপে চলছে রঙ-তুলির কাজ। লাল, নীল, হলুদ আর সবুজ রঙে একেকটি মাটির ঘোড়া বা ময়ূর জীবন্ত হয়ে উঠছে শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায়।
পাইকপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পী নয়ন পাল ও জবা পাল জানান, “সারা বছর কাজ চললেও বৈশাখী মেলাকে ঘিরে আমাদের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই সময়ের উপার্জনেই সারা বছরের লোকসান কিছুটা কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখি আমরা।”
তবে আনন্দের মাঝেই মিশে আছে জীবন সংগ্রামের মলিন সুর। মিন্টু পাল ও বিকাশ পালের মতো প্রবীণ শিল্পীরা জানান, এটি তাদের পৈতৃক পেশা। শুধুমাত্র পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতে এখনো টিকে আছেন এই শিল্পে। কিন্তু বর্তমান বাজারে প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের দাপটে মাটির কদর কমেছে। আধুনিকায়নের এই যুগে অর্থসংকটে পড়ে অনেক পরিবারই এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
শোল্লা এলাকার মৃৎশিল্পী মিঠু পাল আক্ষেপ করে বলেন, “প্লাস্টিক পণ্য মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হলেও বাজার এখন সেগুলোর দখলে। অথচ মাটির তৈরি পণ্য সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসম্মত। সরকার যদি আমাদের স্বল্প সুদে ঋণ বা পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তবেই এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।”
প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, ইতোমধ্যে কিছু পরিবারকে প্রশিক্ষণ ও অনুদানের আওতায় আনা হয়েছে। তালিকায় বাদ পড়া অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে সরকারি প্রণোদনার বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেন্টু কুমার বড়ুয়া বলেন, মৃৎশিল্পীদের জন্য বর্তমানে আলাদা কোনো বিশেষ প্রণোদনা বরাদ্দ নেই। তবে ভবিষ্যতে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা বা সিদ্ধান্ত আসলে অবশ্যই তাদের সহায়তার আওতায় আনা হবে।
হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ এই মৃৎশিল্প। বৈশাখের উৎসবে মাটির পণ্যের চাহিদা বাড়লেও, দীর্ঘমেয়াদী সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব কাটলে তবেই এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকারমুক্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরো পড়ুন: https://haimcharprotidin.com/













