স্টাফ রিপোর্টার:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে। নির্বাচনী ডামাডোল আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও, দলের অভ্যন্তরে চলছে এক নিবিড় কর্মযজ্ঞ যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে তিনি সরাসরি তত্ত্বাবধান করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন ও নজিরবিহীন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমানের একটি ফোন কলই নির্ধারণ করে দিচ্ছে কারা হতে যাচ্ছেন বিএনপির কাঙ্ক্ষিত প্রার্থী। এই ফোন কলের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কে পাচ্ছেন ‘গ্রিন সিগন্যাল’ আর কে ছিটকে যাচ্ছেন নির্বাচনী দৌড় থেকে। দলের অভ্যন্তরে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের চূড়ান্ত ধাপে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজে প্রতিটি আসনে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আগের মতো এবার শুধু সিনিয়রিটি বা কেন্দ্রীয় সম্পর্ক নয়, মাঠের বাস্তবতা ও জনগণের পছন্দই সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। তারেক রহমানের কাছে এখন প্রতিটি আসনের পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট রয়েছে।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “এই মাসের মধ্যেই দলের পক্ষ থেকে দুই শতাধিক আসনে একক প্রার্থীকে গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হবে। আমরা প্রক্রিয়ার একদম শেষ পর্যায়ে আছি।”
ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকার বেশ কয়েকটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা তারেক রহমানের ফোন পেয়েছেন। দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে তরুণ, পেশাজীবী এবং রাজনৈতিকভাবে পরিচিত মুখদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে—যা নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
| আসন | প্রার্থীর নাম | মন্তব্য |
| ঢাকা-৩ | গয়েশ্বর চন্দ্র রায় | সিনিয়র নেতা ও পরীক্ষিত মুখ |
| ঢাকা-৪ | তানভীর আহমেদ রবিন | তরুণ নেতৃত্ব |
| ঢাকা-৬ | ইশরাক হোসেন | তরুণ ও আলোচিত মুখ |
| ঢাকা-৮ | মির্জা আব্বাস | স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী |
| ঢাকা-১০ | ব্যারিস্টার নাছির উদ্দিন আহমেদ অসীম | পেশাজীবী কোটা |
| ঢাকা-১২ | হাবিব উন খান নবী সোহেল | তরুণ ও সক্রিয় নেতা |
| ঢাকা-১৩ | ববি হাজ্জাজ | নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক (জোটের আসন) |
| ঢাকা-১৫ | মামুন হাসান | তরুণ নেতৃত্ব |
| ঢাকা-১৬ | আমিনুল হক | তরুণ নেতৃত্ব |
এবার ঢাকা থেকে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘মায়ের ডাক’ আন্দোলনের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলাম তুলি। তিনি ইতোমধ্যে ঢাকা-১৪ আসনে নির্বাচনের গ্রিন সিগনাল হিসেবে তারেক রহমানের ফোনকল পেয়েছেন। গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন তুলিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা-১৭ আসনটি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-এর সভাপতি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই ধীরে ধীরে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তত ৬০টি আসনে দল ইতোমধ্যেই নির্ভার, যেখানে প্রার্থী নিয়ে কোনো মতভেদ বা অনিশ্চয়তা নেই। এসব ‘নিরাপদ আসনে’ দলের শীর্ষস্থানীয় ও পরীক্ষিত নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় আছেন:
- ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন (কুমিল্লা-১)
- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ঠাকুরগাঁও-১)
- ড. আব্দুল মঈন খান (নরসিংদী-২)
- ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (সিরাজগঞ্জ-২)
- সালাহউদ্দিন আহমদ (কক্সবাজার-১)
- মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ (ভোলা-৩)
- বরকতউল্লাহ বুলু (নোয়াখালী-৩)
- শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি (লক্ষ্মীপুর-৩)
- আসাদুল হাবিব দুলু (লালমনিরহাট-৩)
- লুৎফুজ্জামান বাবর (নেত্রকোনা-৪)
- ফজলুল হক মিলন (গাজীপুর-৫)
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “যারা এলাকায় সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় প্রার্থী হিসেবে পরিচিত, তারাই এবার বিএনপির মনোনয়ন পাবেন। তৃণমূল থেকে শুরু করে অনেকের সঙ্গেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজে কথা বলেছেন।”
এছাড়াও, হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে: যাকে গ্রিন সিগনাল দেওয়া হবে, সবাইকে তার পক্ষেই কাজ করতে হবে। কোনো বিভক্তি বা স্থানীয় কোন্দল সহ্য করা হবে না। এমনকি অভ্যন্তরীণ বিরোধে যুক্ত হলে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই কঠোর বার্তা দলের ভেতরে ঐক্য সুসংহত করার একটি প্রচেষ্টা, যা আগামী নির্বাচনে বিএনপির সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।













